কাজী নজরুলের প্রবন্ধ প্রসঙ্গে

0
269

নজরুলের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ (সওগাত, কার্ত্তিক ১৩২৬)। করাচি সেনানিবাসে বাঙালি পল্টুনে সৈনিক থাকাকালীন তিনি প্রবন্ধটি লিখে পাঠান কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটিতে। পরের চভর নজরুলের তিনটি প্রবন্ধ ‘জননীদের প্রতি’, ‘পশুর খুঁটিনাটি বিশেষত্ব’ ও ‘জীবন বিজ্ঞান’ প্রকাশিত হয় মোসলেম ভারত পত্রিকায়। নজরুলের প্রথম প্রকাশিত মৌলিক প্রবন্ধ ‘উদ্বোধন’ (বকুল, আষাঢ় ১৩২৭) পরে এটি ‘জাগরনী’ নামে ‘যুগবাণী’ গ্রন্থে সংকলিত হয়। উদ্বেধন বা জাগরনী বকুল ফুল নিয়ে একটি আবেগপ্রবণ রচনা। প্রবন্ধিক নজরুলের বিকাশ ঘটে সাংবাদিক হওয়ার পর থেকে। সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ (১৯২০ খ্রি.), অর্ধ সাপ্তাহিক ‘ধুমকেতু’ (১৯২২ খ্রি.), সাপ্তাহিক ‘লাঙল’ (১০২৫-২৬ খ্রি), সাপ্তাহিক ‘গণবাণী’ (১৯২৬ খ্রি.) সমকালীন দেশকাল ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের ঘটনাবলী নিয়ে প্রকাশিত নজরুলের রচনা বা নিবন্ধে। প্রবন্ধ সমূহ পাঁচটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। ‘যুগবাণী’ (১৯২২ খ্রি.), ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ (১৯২৩ খ্রি.), ‘দুর্দিনের যাত্রী’ (১৯২৬ খ্রি.), ‘রুদ্র-মঙ্গল’ (১৯২৬ খ্রি.) ও ‘ধুমকেতু’ (১৯৬১ খ্রি.)। নজরুলের আরও অনেক প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে আছে। আমি আমার আলোচনা এই পাঁচটি প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব এবং নজরুল যে অনেক গ্রন্থের ভূমিকা লিখে দিয়েছেন, যে অভিভাষণ, প্রতিভাষণ দিয়েছেন,সেগুলোকে আলোচনার অন্তর্ভূক্ত করব। তাঁর প্রবন্ধের প্রতিভাগ করা একটি দূরূহ কাজ। তবু আলোচনার সুবিধার্থে প্রবন্ধসমূহকে বিষয়ানুসারে নিন্মোক্ত ভাগে বিভক্ত করে নেয়া যেতে পারে। ক. রাষ্ট্রধর্ম ও স্বাধীনতা বিষয়কপ্রবন্ধ ঃ যুগবাণী-র নবযুগ, গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ, ধর্মঘট, মহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ী কে? উপেক্ষিত শক্তির উদ্বেধন, মুখবন্ধ, আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন, কালঅ আদমীদের গুলি মারো, শ্যাম রাখি না কুল রাখি, জাগরণী, দুর্দিনের যাত্রী-র মোরা লক্ষ্মী ছাড়ার দল, তুবরী বাঁশীর ডাক, মোরা সবাই স্বাধীনঃ মোরা সবাই রাজা, মেয় ভূখা হু, পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ, আমি সৈনিক, রাজবন্ধরি জবানবন্দী, লাঙ্গল পলিটিক্যাল তুবড়িঅবাজি, বাঙ্গালীর বাংলা (ন,র-৪) প্রভৃতি।

খ. শিক্ষাদর্শমূলক ঃ সত্যমিক্ষা, জাতীয় শিক্ষা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (যুগবাণী থেকে)।

গ. ধর্মাদর্শমূলক ঃ যুগবাণী-র ছু’ঃমার্গ, রুদ্রমঙ্গল-এর মোহররম মন্দির ও মসজিদ, হিন্দু মুসলমান আমার ধর্ম, সত্যবাণী (ন. র-৩ থেকে)।

ঘ. বিজ্ঞান বিষয়ক ঃ রোজ কেয়াতম বা প্রলয়দিন (যুবাণী), পশুর খুঁটিনাটি বিশেষত্ব, জীবন-বিজ্ঞান।

 

ঙ. চরিতাদর্শমূলক ঃ যুবাণ-ির ডায়ারের স্মৃতি স্তম্ভ, লোকমান্য তিলকের মৃত্যুতে বেদনাতুর কলিকাতার দৃশ্য, লাট প্রেমিক আলী ইমাম, দুর্দিনের যাত্রী-র স্বাগত, ধুমকেতু-র কামাল।

 

চ. সাহিত্য ও শিল্প ভাবনা বিষয়ক ঃ যুগবাণী-র বাংলা সাহিত্যে মুসলমান, ধুমকেতু-র বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য বড়র পীড়িতি বালির বাঁধ বর্ষারম্ভে, আমার সুন্দর (ধুমকেতু)।

 

ছ. বিবিধঃ যুগবাণী-র বাঙালির ব্যবসাদারী, ভাব ও কাজ, ধুমকেতু-র ভাববার কথা। জননীদের প্রতি, তৃর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা।

 

জ. ভাষণ-অভিভাষণ ঃ চট্টগ্রাম বুলবুল সোসাইটি ভাষণ (১৯২৯ খ্রি.)। চট্টগ্রাম এডুকেশনসোসাইটি ভাষণ (১৯২৯ খ্রি.), সিরাজগঞ্জ মুসলিম তরুণ সম্মেলনে ভাষণ (১৯৩২ খ্রি.),  জন সাহিত্য সংসদ উদ্বেধনী ভাষণ (১৯৩৮ খ্রি.), কলকাতা এলবার্ট হলে ভাষণ (১৯৩৯ খ্রি.), ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র-সম্মিলনী ভাষণ ( ১৩৪২ বঙ্গাব্দ), বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ভাষণ (১৩৪৪ বঙ্গাব্দ), কলকাতা সিরাজী লাইব্রেরী ভাষণ (১৯৪০ খ্রি.), ওস্তাদ জমির উদ্দিন খাঁ’র শোকসভার ভাষণ (১৯৩৯ খ্রি.), কলকাতা মুসলিম ইন্সস্টিটিউট হলে ভাষণ (১৯৪০ খ্রি.), বনগাঁ সাহিত্য সভার ভাষণ (১৯৪১ খ্রি.), কলকাতা মুসলিম ইন্সস্টিটিউটে শেষ ভাষণ (১৯৪১ খ্রি.)।

 

ঝ. পুস্তক-সমালোচনা ঃ স্মৃতি লেখা কাব্য-খগেন ঘোষ, আয়না আবুল মনসুর আহমদ, পথ হারার পথ-শ্রী বরদা চরণ মজুমদার, সুজনের গাান-গিলিণ চক্রবর্তী,শেকওয়া ও জবাবে শেকওয়া এম সুলতান, হারামণি-মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন, দিলরুবা-আব্দুল কাদির, সাঁঝেরমায়া-বেগম সুফিয়া কামাল, আগামীবারের সমাপ্য-মোহাম্মদ কাসেম, বন্দীর বাঁশি-বেনজীর আহমেদ।

নজরুলে প্রবন্ধ রচনা করার তাগিদ এসছিল-তাঁর সম্পাদিত দৈনিক নবযুগ (১৯২৩, ১৯৩৫ খ্রি.), অর্ধ সাপ্তাহিক ধুমকেতু (১৯২২ খ্রি.) ও সাপ্তাহিক লাঙ্গল (১৯২৫ খ্রি.) পত্রিকার কাছ থেকে। উক্ত পত্রিকা সমূহ তিনি সম্পাদকীয় ছাড়াও অনেক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। উপরের বিভাগ অনুসারে সংক্ষেপে নজরুলের প্রবন্ধের আলোচনা করা যাক ঃ

রাষ্ট্রাদর্শ ও স্বাধীনতা বিষয়ক প্রবন্ধ : নজরুল ইসলাম ছিলেন পরাধীন ভারতের অধিবাসী। বৃটিশ বেনিয়া সরকার তখন ভারতের শাসন-কর্তা। অত্যাচার অবিচারের লীলাভূমি যেন তখনকার ভারত-বর্ষ। নজরুলের লেখনী তা দেখে গর্জে উঠেছে-আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ’ রাজত্বে তা’ হবে রাজদ্রোহ। এ তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না। এই যে জোর করে সত্যকে মিথ্যা, অন্যায়কে  ন্যায়, দিনকে রাত বলানো একি সত্য সহ্য করতে পারে? এতদিন হয়েছিল, হয়তো সত্য উদাসীন ছিল বলে। ’(-রাজবন্দীর জবানবন্দী)। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে রাজদ্রোহের অপরাধে ধৃত হয়ে ইংরেজ বিচারক সুইনহো-এর আদালতে এ জবানবন্দী দিয়েছিলেন নজরুল। তিনি তাঁর অধিকাংশ প্রবন্ধেই দেশের স্বাধীনতার কথা বিভিন্নভাবে বলবার চেষ্টা করেছেন-‘সর্ব প্রথম ‘ধুমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।…ভারত বর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোন বিদেশীর মোড়লী করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। …পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল কিছু নিয়ম, বাঁধন-শৃঙ্খলা মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।’-(ধুমকেতুর পথ-রুদ্র মঙ্গল)। ‘ভারত হবে ভারতবাসীর’-এ হ’ল নজরুলের রাষ্ট্রদর্শ ও স্বাধীনতা বিষয়ক প্রবন্ধগুলোর সারমর্ম। দেশ ও স্বাধীনতার কথা লিখতে গিয়ে তিনি দেশের মানুষের সাঙ্গে একাকার হয়ে গেছেন। কাব্যের মত প্রবন্ধেও তিনি কৃষক-শ্রমিক মজদুর মানুষের হয়ে তিনি সংগ্রাম করেছেন, শোষণহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা দৃঢ়কণ্ঠে গোষণা করেছেন। সমালোচক মনে করেন-‘নজরুলের বিদ্রোহ কোন বিশেষ মতবাদের খাদে প্রবাহিত নয়। তাঁর বিদ্রোহের মূলে স্বভাবগত অকৃত্রিম মানব প্রেম এবং সে প্রেমের প্রকাশ তাঁর অন্তরের নির্দেশানুসারে। শুধু স্বদেশেই নয়, বিশ্বের মানব গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি একাত্মতা অনুভব করেন বলেই তাঁর রোমান্টিক কবি-চিত্ত মানুষের নির্যাতন, লাঞ্ছনা, শোষণ প্রর্ভৃতি উচ্ছেদ করতে বিদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

শিক্ষাদশৃমূলক প্রবন্ধ ঃ যে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদেশী অনুকরণ সবচেয়ে প্রবল, নজরুল তা বর্জন করতে বলেছেন। তাঁর মতে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি এমন হউক, যাহা আমাদের জীবন শক্তিকে ক্রমেই সজাগ জীবন্ত করিয়া তুলিবে। যে শিক্ষা ছেলেদের দেহ-মন দুইকে পুষ্ট করে তাহাই হইবে আমাদের শিক্ষা। ‘মেদা-মারা’ ছেলের চেয়ে যে ছেলে ডানপিটে ছেলে বরং অনেক ভাল। কারণ পূর্বোক্ত নিরীহ জীবরূপী ছেলেদের ‘জান’ থাকে না। আর যাহার ‘জান’ নাই সে ‘মোর্দা’ দিয়া কোন কাজই হয় না, আর হইবেও না।-(জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-যুগবাণী)। শুধু স্কুল কলেজ দাঁড় করলেই চলবে না। সেখানে প্রকৃত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এবং প্রকৃত শিক্ষা বলতে নজরুল যা বুঝাতে চান তা’ হলো-‘ভাবী দেশ সেবকদের স্বজাতি-স্বদেশের প্রতি অনাস্থা শেকঅনো নয়, তাহারা শিখিবে দেশের কাহিনী, জাতীর বীরত্ব, ভ্রাতার পৌরুষ, স্বধর্মের সত্য…।-(সত্য শিক্ষা-যুগবাণী)।

ধর্মদর্শমূলক রচনা ঃ নজরুল হিন্দু, মুসলমানের পরিপূর্ণ শিলনে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর ধর্ম কবির ধর্ম।-শিল্পীর ধর্ম। কোন ভেদ জ্ঞান নয়-সবাই তার আপন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর মিল আছে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ধর্ম সম্পর্কে বলেছেন -গু ৎবষরমরড়হ রং বংংবহঃরধষষু ধ ঢ়ড়বঃ ৎবষরমরড়হ.ওঃং ঃড়ঁপয পড়সবং ঃড় সব ঃযৎড়ঁময ঃযব ংধসব ঁহংববহ ধহফ ঃৎধপশষবংং পযধহহবষং ধং ফড়বং ঃযব রহংঢ়রৎধঃরড়হ ড়ভ সু সঁংরপ, গু ৎবষরমরড়হং ষরভব যধং ভধষষড়বিফ ঃযব ংধসব সুংঃবৎরড়ঁং ষরহব ড়ভ মৎড়ঁঃয ধং যধং সু ঢ়ড়বঃৎরপধষ ষরভব. (ঞযব ৎবষরমরড়হ ড়ভ ধহ ধৎঃ-জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব.১৯৫৩, ঢ়ধমব ১০).

আমরা নজরুলের কণ্ঠে শুনি ‘হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার এই মহাগগণতলের সীমাহারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া-মানব!-তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদি-বাণী ফুটাও দেখি-‘আমার মানুষ ধর্ম।’-(ছুগমার্গ-যুগবাণী)। নজরুলের ধর্ম দর্শমূলক প্রবন্ধের এই হ’ল মূল কথা। ‘নজরুল ইসলাম কোন বিশেষ ধর্মের অনুসারী ছিলেন বলা যায় না। তিনি দেশ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান উদারতায় ভাল বাসতে পেরেছেন। (বিচিত্র-চিন্তা-ড. আহমদ শরীফ, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ৪০০)।

বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা ঃ বিজ্ঞান-বিষয়ক রচনা নজরুলের বেশি নেই। তবে যে ক’টি আছে, তাতে তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞানের প্রতুলতা লক্ষ করা যায়। তিনি রোজ-কিয়ামত বা প্রলয়-দিন প্রসঙ্গে লিখেছেন-‘কয়লা-যুগের সময় এই পৃথিবীর বাতাস কার্বলিক এসিডের দরুণ ভারী ছিল। সে সময় সে বাতাস মানুষে সহ্য করিতে পারিত না। কেবল মৎস্য ও সরীসৃপ জাতীয় জীববৃন্দ স্রােতময় জলাভূমিতে নিশ্চল বাতাসে বাঁচিয়াছিল। ক্রমশঃ উদ্ভিদ ও গাছ-গাছরায় বিপুল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঐ বিষাক্ত নিশ্চল বাতাস দূর হইয়া যাইতে লাগিল। আকাশ পরিস্কার হইল এইরূপে এই বাতাস উষ্ণ রক্তময় জীবের উপযোগী হইয়া উঠিল।’-(যুগবাণী)।

চরিতার্থমূলক পবন্ধ ঃ সাহিত্য জীবনের প্রথম যুগে নজরুল ছিলেন কামাল-পন্থী। কামাল আতাতুর্কের দেশপ্রেম তাঁকে দেশ উদ্ধারের প্রেরণা যুগিয়েছিল। তাই কামাল প্রবন্ধে দেখা-‘সত্য মুসলমান কামাল বুঝেছিল যে খিলাফত উদ্ধার ও দেশ উদ্ধার করতে হ’লে ‘হায়দারীহাঁক হাঁকা চাই।’ (ধূমকেতু)।

মানুষের জাতির, দেশের যখন চরম অবনতি হয়, তখন নরপিশাচ জালিমের আবির্ভাব অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকা- ভারতের ‘গোলাম-কা-জাতকে’ নতুন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। নজরুলের ধারণা-‘ডায়ারের বুটে এমন করিয়া আমাদের কলিজা মথিত না করিয়া গেলে তোমাদের চেতন হইত না।’ তাই ডায়ারের স্মৃতি স্তম্ভের প্রতি নজরুলের এত ভক্তি। চরিতাদর্শমূলক প্রবন্ধের মাধ্যমে নজরুল কোন বিশিষ্ট চরিত্র আলোচনার নিরিখে ভারতবাসীর দেশপ্রেমকে জাগ্রত করবার চেষ্টা করেছেন।

সাহিত্য ও শিল্পভাবনা বিষয়ক প্রবন্ধ ঃ ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে নজরুল বিশ্বের শক্তিধর লেখকদের পরিচয় দেবার চেষ্টা করেছেন। তিনি বিশ্বসাহিত্যের দু’টি রূপ রূপ দেখেছেন। একদকে নোগুচি, ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি অন্যদিকে গোর্কি, যোহান, রোয়ার, বার্ণডশ, বেনাভাবে প্রভৃতি। তাছাড়া তিনি, রিউনিদ, ন্যুটহামসুন, ওয়াদিশল,রেম’দ, আনাতোল ফ্রাঁস, টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, পুশকিন, গ্রাৎসিয়াদেলেদ্দা, বালজাক, জোলা, কিপলিং, কীটস, হুইটম্যান প্রভৃতি কবি সাহিত্যিকের কথা আলোচনা করেছেন। সমালোচনা করেছেন-  ঞযব ৎিড়ঃব বংংধুং ড়হ ধ ারফব াধৎরবঃু ড়ভ ংঁনলবপঃং, ঙহব ড়ভ যরং ভরহবংঃ ঢ়রবপব রং পধষষবফ, দডড়ৎষফ ষরঃবৎধঃঁৎব ঃড়ফধু,’ ঞযরং রং নধংবফ ড়হ ধ াবৎু ঢ়বৎংড়হধষ বাধষঁধঃরড়হ ড়ভ ঃযব ষরঃবৎধঃঁৎব ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ. ঐরং লঁফমসবহঃং সধু হড়ঃ নব যিড়ষষু ধপপবঢ়ঃধনষব, নঁঃ যরং ঢ়ৎবভবৎবহপবং ধৎব ৎবাবধষরহম. ঐব সবহঃরড়হং ঃযব ঊহমষরংয ৎড়সধহঃরপ ঢ়ড়বঃং রিঃয ৎবংঢ়বপঃ নঁঃ ষবধাবং ড়ঁঃ ডড়ৎফংড়িৎঃয ধহফ ঈড়ষবৎরফমব ভৎড়স যরং ৎবারব,ি’

‘বাঙলা সাহিত্যে মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি সাহিত্যিক-কবিদের ধর্ম-বিদ্বেষ, জাতি-বিদ্বেষ, প্রভৃতির ঊর্দ্ধে উঠে সাহিত্য সাধনা করতে বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন-‘শরীর নিরোগ হইলে মনে আপনি একটা নির্মল আনন্দ উছলিয়া পড়িতে থাকে। দেখিবেন, যে সাহিত্যিকের স্বাস্থ্য যত ভাল, যিনি যত বেশি প্রফুল্লচিত্ত, তাঁর লেখা তত বেশি স্বাস্থ্যসম্পন্ন, তত বেশি কল-মুখর। নবীণ সাহিত্যিকগণ সর্বদা প্রফুল্লচিত্ত থাকিবার জন্য যদি আধটু করিয়া সঙ্গীতের আলোচনা করেন, তাহা হইলে দেখিবে তাহাদের লেখার মধ্যে এই সঙ্গীত, সুরের এই ঝংকার, উন্মক্ত প্রফুল্লচিত্তের এই মোহন বিকাশ ফুটিয়া উঠিয়া তাহাদের লেখার মধ্যে এই নতুন মাদকতা, অভিনব, শক্তিদান করিতেছে।’ সাহিত্যে সার্বজনিনতা সৃষ্টির জন্যও তিনি নতুন লেখকদের উপদেশ দিয়েছেন।

‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে নজরুল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের রাগের প্রতিকার করবার চেষ্ঠা করেছেন। অর্থাৎ ‘খুন’ শব্দ ব্যবহারের জন্যরবীন্দ্রনাথ নজরুলের উপর রেগে গিয়েছিলেন। কারণ রবীন্দ্রনাথ ‘খুন’ এর পরিবর্তে রকবত লেখার পক্ষপাতি। নজরুল বলেছেন, ‘আমি শুধু ‘খুন’ নয়-বাংলায় চরতি আরো  অনেক আরবি ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছি আমার লেখায। আমার দিকে থেকে এর একটা জবাবদিহি আছে। আমি মনে করি বিশ্ব-কাব্য লক্ষèীর একটা মুসলমানী ঢং আছে। ও সাজে তার শ্রীহীন হয়েছে বলেও আমার জানা নেই।’ প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা  যেতে পারে যে, নজরুলের এ প্রবন্ধের উত্তরে প্রমথ চৌধুরী ‘বঙ্গ সাহিত্যে খুনের মামলা’ লেখেন। নজরুলের সাহিত্য ও শিল্পভাবনা বিষয়ক প্রবন্ধগুলোর মূল্য অপরিসীম।

বিবিধি ঃ বাঙালীর ব্যবসাদারী, ভাব ও কাজ, ভাববার কথা, জননীদের প্রতি, তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা-প্রভৃতি প্রবন্ধে নজরুল বিচিত্র চিন্তা শক্তির পরিচয় দিয়েছেন।

অভিভাষণ ঃ এপর্যন্ত নজরুলের ১২ টি অভিভাষণের সন্ধান পাওয়া গেছে। অভিভাষণগুলোতে তিনি ‘সুন্দরের ধেয়ানী দুলাল। সুন্দরের উপাসনাই তাঁর স্ববগান ও ধর্ম।’ ‘আমিত্ব-সুন্দরম’ মধুরম ব্যথা দেওয়ার জন্য অভিভাষণগুােতে তাঁর কবি-মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। তারুণ্যের যৌবনের জয়গানে মুখরিত অভিভাষণগুলো যেন ‘গদ্য কবিতার কবি নজরুল-কে জন্ম দিয়েছে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে শিল্প-সঙ্গীতে সাহিত্যে মুসলমানদের বিরাট অবদানের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন এবং হিংসায়, ঈর্ষায়, কলহে, ঐক্যহীন বিচ্ছিন্ন মুসলিম সমাজকে তিনি ভেদ-বিভেদের প্রাচীর ভেঙে ‘এক জামাতে’ সামিল হ’তে বলেছেন। তাঁর ধারণা, সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্রবাদে উৎসমূল ইসলামেই নিহীত।  অভিভাষণগুলোতে তাঁর সাহিত্য চিন্তারও ছাপ বিদ্যমান। তিনি তাঁর সাহিত্য সাধন সম্পর্কে বলেছেন-“আমার সাহিত্য সাধনায় বিশ্বাস ছিল না। আমি আমার জন্মক্ষণ থেকে যেন আমার শক্তি বা আমার অস্তিত্বকে ঊীরংঃবহপব কে খুঁজে ফিরছি, তার দেখা পেয়েছি।… নদী যেমন সাগরকে পেয়েছে নিত্য-কাঁদে নিত্ত মিলন, নিত্ত বিরহের রস উপলব্ধি করে, আমি তেমনি করে তাতে যুক্ত থেকেও তার জন্য কাদিব- সেই ক্রন্দন যদি সাহিত্য না হয়, কবিতা না হয়, আপনাদের ক্ষমা সুন্দর মন যেন এই প্রেম-ভিক্ষুককে ক্ষমা করে।”-বনর্গা সাহিত্য সভায় ভষণ)।

সাহিত্য সকলেরই প্রয়োজন আছে। তাই জন-সাহিত্যের সৃষ্টি করে জনগণের জন্য রস পরিবেশন করবার কথাও তিনি ভেবেছেন-‘এদের জন্য যে সাহিত্য তা ওরা এখনো যেমনভাবে পুঁথি পড়ে, আমি হামজা, সোনাভান, আলেফ লায়লা, কাছাচল আম্বিয়া তখনো সেইভাবে পড়বে। ওদের সাহিত্যের মধ্যে দিইে ওদেরকে শিক্ষা দিতে হবে। (কলিকাতা জন-সাহিত্য সংসদ ভাষণ)।

আবেগ তাঁর কাব্য সাহিত্যের শিল্পগুণ ক্ষুণœ করেছে-সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন,-“ আমার আবেগে যা এসছিল,তাই আমি সহজভাবে বলেছি। আমি যা অনুভব করেছি, তাই আমি বলেছি। এতে আমার কৃত্তিমতা ছিল না।” (জন-সাহিত্য সংসদ ভাষণ)। বলাবাহুল্য বিভিন্ন সভা-সতিতিতে প্রদত্ নজরুলের ভাষণগুলো বাংলাসাহিত্যের মূলবান সৃষ্টি। ‘বাংলা বিশ্বকোষে’ আছে-বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণগুলি নজরুল প্রতিভার উল্লেখযোগ্য নিদর্শণ (বাংলা বিশ্বকোষ : তৃতীয় খ-)। নজরুল তারুণ্যকে ভাল বাসতেন, এবং তরুণদের নিয়ে নতুন সমাজ গড়াবার তিনি যে ইচ্ছা  পোষণ করেন-তা তাঁর ‘তরুণের সাধনা’ অবিভাষণটিতে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। সে সম্পর্কে সমালোচক বলেছেন- “ঐব ঢ়ধরফ ৎরপয ঃৎরনঁঃবং ঃড় ঃযব ুড়ঁঃয রহ ঃযব পড়ঁহঃৎু রহ যিড়স যব ংধি যড়ঢ়ব, ঃযব ড়হষু যড়ঢ়ব ড়ভ নঁরষফরহম ঁঢ় ধ হবি ংড়পরবঃু.”  (ওহঃৎড়ফঁপরহম ঘধুৎঁষ ওংষধস,ষনরফ, ঢ়-৬৮)

পুস্তক সমালোচনা ঃ নজরুল অনেক লেখক-লেখিকার বইয়ের ভূমিকা-আলোচনা-সমালোচনা লিখেছেন। এ ধরণের দশটি রচনা আমার হাতে আছে-খগেন ঘোষ, আবুল মনসুর আহমেদ, শ্রী বারদা চন্দ্র মজুমদার, গিরিণ চক্রবর্তী, এম সুলতান, মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন, আব্দুল কাদির. বেগম সুফিয়া কামাল, মোহাম্মদ কাশেম, বে-নজীর আহমদ প্রমুখের বইয়ের আলোচনা-সমালোচনা। নজরুলের এ’সব সমালোচনায় একটি জিনিস দেখবার মতো-তা হলো-তরুণ লেখক-লেখিকাদের উৎসাহ দেয়া। কবি আব্দুল কাদিরের ‘দিলরুবা’র সমালোচনায় নজরুল লিখেছেন-‘কবি যখন নীহারিকালোক থেকে ওঠার স্বপ্ন দেখছিলেন, সেইদিনের প্রকাশ অপ্রকাশ বিজড়িত, ইঙ্গিত-সঙ্গীত-রহস্যমাখা, কইতে পারা-না-পারার আভাস-এর অনেক কবিতায় পাওয়া যায়।’তবুও দিলরুবা’র হৃদয়তন্ত্রীতে যে সুর শুনি, এ যুগের নাম করা বহু কবির বাঁশীতে সে সুর শুনতে পাইনে। এর ভাগ্য-লক্ষèী চোখের অতল-রহস্য, নিবিড় গভীরতা, প্রথম প্রথম আমার আলাপ করতে একটু ভয় হয়। কিন্তু ভয় ভেঙে গেলে তখন পৃথিবীর কোন কিছু মনে থাকে না। এর সুর মাঠের রাখালের তলতা-বাঁশীর মেঠো সুর নয়; গুণীর হাতের দিলরুবার আলাপ বুঝবার মত সমঝদার যারা এ’ তাদেরআ জন্য’।

বেগম সুফিয়া কামালের ‘সাঁঝের মায়া’র কবিত্বপূর্ণ সমালোচনার কিছুটা নমুনা দেয়া যাক-‘সাঁঝের মায়া’র কবিতাগুলি ‘সাঁঝের মায়া’র মতই যেন বিষাদ-ঘন, তেমনি রঙিন গোধুলীর রঙে রঙিন। এ সন্ধ্য তিথির সন্ধ্যা নয়, শুক্লাচতুর্দশীর সন্ধ্যা। প্রতিভার পূর্ণ চন্দ্র আবির্ভাবের জন্য বুঝি এমনি বেদনাপুঞ্জিত অন্ধকারের প্রয়োজন আছে। নিশীত-চম্পার পেয়ালায় চাঁদনীর সিরাজী এবার বুঝি কানায় কানায় পুরে উঠবে বিরহ যে ক্ষতি নয়, ‘সাঁঝের মায়াই তার অনুপম নিদর্শণ’।

নজরুল ইসলাম তাঁর প্রবন্ধে প্রকাশ ভঙ্গির সরলতা এনেছিলেন সন্দেহ নেই। সমালোচক বলেছেন- ধূমকেতু’র সম্পাদক হিসাবে নজরুল যখন তাঁর অনলবর্ষী সম্পাদকীয় প্রবন্ধমালা রচনা করেন, তখন তা’একাধারে বাংলা সাহিত্যে প্রকাশ ভঙ্গির সবলতা এবং বিদেশী রাজ-শক্তির বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের প্রচ-তাকে সার্থক-ভাবেই রূপদান করতে সক্ষম হয়েছিল। (সাহিত্যশিল্পী আবুল ফজল-আণোয়ার পাশা)।……………….

নজরুল-প্রবন্ধের ত্রুটি ভাবোচ্ছাস এবং ভাষার বহুল অলংকারিতা ঃ তাঁর প্রবন্ধে উপমা-রূপক-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্পের ছড়াছড়ি দেখা যায়, যা বুদ্ধিকে আড়ষ্ট করে। প্রবন্ধ-অভিভাষণ-পুস্তক শক্তিালী কবি প্রতিভার আরেক  রূপ। সমালোচক প্রবন্ধকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে যা বলেছেন-তা নজরুলের বেলায় ব্যবহার করা যেতে পারে-‘রবীন্দ্রনাথ প্রাবন্ধিক বা প্রবন্ধ-বিজ্ঞানী নন, তিনি প্রবন্ধ শিল্পী। শিল্পীর থাকে রূপ-রচনার আবেগ ও কৌশল এই আগ্রহ ও কৌশল তিনি যে গদ্য রচনাগুলিতে রূপ দিয়েছেন, সেগুলিও তাই যথাবিধি শিল্প কর্ম হয়ে উঠেছে। (গদ্য-শিল্পী রবীন্দ্রনাথ-সুখরঞ্জন মুখোপাধ্যায়)

প্রবন্ধকার নজরুলের বেলায়ও  এ কথা খাটে। নজরুলের প্রবন্ধ তাই তাঁর সার্বভৌম কবিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তিনি প্রবন্ধ শিল্পী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here